সাকিব আল হাসান
১৯৮৭ সালের ২৪ মার্চ খু্লনা বিভাগীয় মাগুরা জেলায় তার জন্ম। ছোট বেলা থেকেই ছিলেন প্রচণ্ড পরিমাণে ফুটবল পাগল। এই ছেলেকে দেখে তৎকালীন কেউই ভাবেনি যে, সে একদিন ফুটবল ছেড়ে রাজত্ব করবে ক্রিকেটে।
কিন্তু হ্যাঁ, অনেক সময় জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে, যেটা বরারবরই থাকে আমাদের ভাবনার বাইরে। বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে পাড়ার ক্রিকেট খেলেই সূচনা এই প্রতিভার।
এরপর ক্রিকেটে দারুণ প্রতিভার ফলে স্কুলের স্যারদের অনুরোধে খেলেছেন স্কুল ক্রিকেট। এরপর বিকেএসপি’র বয়স ভিত্তিক দলে নিয়মিত পারফর্ম; ফলস্বরূপ ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট ৮১ নাম্বার ক্যাপ নিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার।
ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম, দলের প্রয়োজনে রান করা এবং বল হাতেও প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ত্রাসে পরিণত হয়ে উঠেন তিনি।
এর কিছুদিন পর, ১৮ মে ২০০৭ সালে অভিষিক্ত হয়ে যান টেস্ট ক্রিকেটেও। ক্যাপ নাম্বার ৪৬। প্রথম টেস্ট ম্যাচটাই খেলেছেন বিশ্বক্রিকেটের পরাশক্তি ভারতের বিপক্ষে।
সাকিব আল হাসানের টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই বাংলাদেশ দলের চিত্র পুরো চেঞ্জ! যেখানে সেই সময়টাতে দলের একটা উইকেট পতন হলে সবাই ধরেই নিতো, এই যে শুরু হলো আসা যাওয়ার খেলা;
সেখানে সাকিব আল হাসান এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে খেলতেন স্বাচ্ছন্দে অনেকটা সময়। দলকেও এনে দিতেন লড়াই করার মতো বড় সংগ্রহ।
সে বছর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে খেলেছেন ম্যাচ জেতানো পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস। এরপর থেকেই শুরু সাকিব আল হাসান ‘ম্যাজিক’।
জাতীয় দলে নিয়মিত পারফর্ম করার সুবাদে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন কাউন্টিতে। অর্জনটা সেখানেই থেমে নয়, ধারাবাহিক সাফল্য তাকে তুলে ধরেছে পুরো বিশ্ব দরবারে। খেলেছেন আইপিএল, সিপিএল, পিএসএল, এসএলপিএল সহ বিশ্বের জনপ্রিয় সব টি-২০ লিগে।
২০১১ সালে ঘরের মাটিতে হওয়া বিশ্বকাপে ছিলেন দলীয় ক্যাপ্টেন। সাকিব আল হাসানই বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়ার, যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজারের বেশি রানের পাশাপাশি ৫০০ উইকেটের মালিকও, যেটা সবদল বিবেচনায় বিশ্বে তৃতীয়।
বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে একই সঙ্গে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-২০ তে হয়েছেন নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার।
নাহ, সাকিব আল হাসানের পারফরমেন্স নিয়ে এর বেশি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই, কারণ বাংলাদেশের কোটি ক্রিকেট প্রেমীরা জানেন খেলোয়ার সাকিব আল হাসানের দক্ষতা এবং দেশের জন্য এনে দেয়া সব অর্জন।
![]() |
| Add caption |
এবার আসি সাকিবকে নিয়ে ‘বিতর্ক’র বিষয়বস্তুতে-
সম্প্রতি বাজে পারফরমেন্স যাচ্ছে সাকিব আল হাসানের। যদিও সদ্য শেষ করে আসা আইপিএলে শৈল্পিক ক্রিকেট উপহার দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ‘ভিভো আইপিএল ২০১৮’ এর সেরা তিন খেলোয়ারের তালিকায়। কিন্তু দেশের হয়ে কথা বলছে না তার ব্যাট, কাজ করছে না স্পিন জাদুও। আর তাইতো তার ওপর দিব্যি খেপে উঠেছে সমর্থকেরা।
প্রত্যাশার পারদ ছড়িয়ে দেয়া সাকিব আল হাসান কেনো এতটা বাজে ফর্মে! এখানেই ঘটেছে যত বিপত্তি। ভালো খেলতে না পারায় গুটিকয়েক সমর্থকের ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠেছেন তিনি, শুনছেন বিশ্রি সব গালি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে রীতিমত ক্ষোভ ঝাড়ছেন ভক্তরা।
কেউবা আবার করছেন অযৌক্তিক সব ট্রল। এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; কেউ একজন কিছুদিন আগে হঠাৎ করে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ‘অপরাধী’ গানটাকে নকল করে সাকিবকেই বানিয়েছেন অপরাধী।
ভক্তদের আরো অভিযোগ- তিনি অনেক মুডি স্বভাবের। কেউ সেলফি তুলতে গেলে বা অটোগ্রাফ নিতে গেলে অশোভন আচরণ করে। তিনি দলের জন্য খেলেন না, নিজের জন্য খেলেন। সাকিব আল হাসান টাকার পাগল, ইত্যাদি আরো কত কী!
এই ধরনের মন্তব্য করা সমর্থকদের জন্য ব্যক্তি সাকিব আল হাসানকে কাঠগড়ায় নিয়ে আসি বিশ্লেষণের জন্য।
সাকিব আল হাসান বরাবরই ভক্তপ্রিয়। ভক্তদের আবদারে সেলফি তোলা/অটোগ্রাফ দেয়ার বিষয়ে তিনি খুবই সচেতন। তার কথায়, ‘ভক্তরাই আমার কাছে সব। আজকের আমি সাকিব আল হাসান হয়েছি আপনাদের সমর্থন আর দোয়ার কারণেই।’
তাহলে এই কথা কোত্থেকে আসলো বা কেনো আসলো যে, তিনি ভক্তদের আবদারে সেলফি তুলতে চান না বা ভাব নেন?
সাকিব আল হাসান হুয়াওয়ে মোবাইল কোম্পানির ব্রান্ড এম্বাসেডর। গত রমজানের ইদে হুয়াওয়ে ফোন ক্রেতাদের মধ্য থেকে সেলফি কনটেস্টে বিজয়ীদেরকে নিয়ে কোম্পানিটি আয়োজন করে চায়না ভ্রমণের। যথারীতি ভ্রমণ শেষ করে সাকিব আল হাসান নেমেছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
একমাত্র মেয়ে আলাইনা খানিকটা অসুস্থ, সেই সঙ্গে দীর্ঘভ্রমণে ক্লান্ত তিনি নিজেও। এমন সময় এক ভক্ত সেখানে হাজির; আবদার করলেন ছবি তোলার।
সাকিব তাকে বললেন, একটু ওয়েট করুন, আমি মালামালগুলো গাড়িতে তুলে নেই। খানিক সময় পর সাকিব নিজেই তার সামনে আসলেন, বললেন- ‘ছবি তুলবেন বলেছিলেন,তুলুন!’ তারপর সেই ভক্ত বিভিন্ন পোজ নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলেন...
বলা বাহুল্য যে, ওই ভক্ত সম্ভবত ভেবেছিলেন, একই ব্যক্তির সঙ্গে এক হাজার ছবি তুলে তিনি গিনেজ বুকে নাম লেখাবেন!
৩-৪ মিনিটেও যখন ওনার ছবি তোলা শেষ হয় না, ওদিকে মেয়েও অসুস্থ, সাকিব তাকে খানিকটা বিরক্তির সুরেই বললেন, ‘ভাই আর কত তুলবেন?’ এই কথাটাই সাকিবের জন্য হয়ে গেলো কালসাপ!
সেই ভক্ত মহাউৎসাহ নিয়ে ইন্টারভিউ দিলেন কয়েকটি পোর্টালে, বললেন; সাকিব বেয়াদব, ভাব নেয়, ছবি তুলতে চাওয়ায় ধমক দিয়েছেন, অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন, আরো কত কী?
অথচ কোনো দিনমজুর সাকিবের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলেও ফিরিয়ে দেন না তিনি, উল্টো হাসিমুখে বাহুতে হাত রেখে ছবি তুলেন।
এবার আসি ‘তিনি দেশের জন্য খেলেন না, নিজের জন্য খেলেন’ এই কথার বিশ্লেষণে-
সাকিব আল হাসানের দেশপ্রেম সম্পর্কে তার কাছের মানুষেরা বা জাতীয় দলের সতীর্থ্যরা বেশ ভালো জানেন। কোনো ম্যাচ জিততে জিততে হেরে গেলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন বাচ্চাদের মতো করে। টিমমেটদেরকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলতে থাকেন দীর্ঘ সময়।
শ্রীলংকার মাটিতে কিছুদিন আগে সম্পন্ন হওয়া নিদাহাস ট্রফির কথা মনে আছে আপনাদের?
বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকার ম্যাচ। শেষ ওভারের টানটান উত্তেজনা, সেই সঙ্গে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ। হঠাৎ করেই আম্পায়ার কর্তৃক একটা বাজে সীদ্ধান্তের স্বীকার টিম বাংলাদেশ। ক্রিজে ছিলেন তখন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এবং তাসকিন আহমেদ।
বলটা ছিলো জেনুইন ‘নো’ বল। কিন্তু মেইন আম্পায়ার ‘নো’ কল না দেয়াতেই শুরু হয় বিতর্ক। সাকিব অাল হাসান তর্কে জড়িয়ে পড়েন ম্যাচ রেফারির সঙ্গে।
ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যানদের ইশারায় উঠে আসতে বলেন মাঠ থেকে। তিনি জানতেন, এটার জন্য তার জরিমানা হবে নিশ্চিত, তবুও এই ‘নো’ টা না দিলে দলের জয়টা হয়ে যেতে পারে হাত ছাড়া,তাই বেজায় উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ মাঠ ছাড়েননি, শ্রীলংকা ক্রিকেটার ও আম্পায়ারদের অনুরোধে মাঠে থেকে দলকে জিতিয়েই ফিরেছেন তিনি।
রিয়াদ মাঠ ছেড়ে আসেননি, তবুও সাকিব আল হাসানকে গুনতে হয়েছে অর্থ জরিমানা। এবার ভাবুন তো, যদি মাঠ ছাড়তো, তবে অধিনায়ক সাকিব আরো বড় ধরনের শাস্তি পেতেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটা হতে পারতো লম্বা সময় নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্তও।
যদি সাকিব নিজের জন্যই খেলতেন, তবে কেনো যেচে গিয়ে জরিমানা বা নিষিদ্ধ হতে চাইতেন? বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক ‘মাশরাফি বিন মর্তুজা’ কী বলেন সাকিব সম্পর্কে, চলুন জেনে নেই।
মাশরাফির ভাষ্যমতে- সাকিব খুবই ইমোশনাল। যে কোনো ম্যাচে দল হারলেই ও হাউমাউ করে কান্না করে দেয়।
এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে-
আপনি জানেন কি- সাকিব আল হাসান এর দেয়া অর্থে পরিচালিত হয় ৩০টিরও অধিক এতিমখানা, কয়েকটি মাদরাসা এবং স্কুল, বেশ কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রম?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় দলেরই একজন খেলোয়ার বলেন, সাকিব ভাই গোপনে অনেক সামাজিক উন্নয়ণমূলক কাজ করেন। উনি সাধারণত এসব বিষয় পাবলিশ করতে পছন্দ করেন না। কিছুদিন আগেও এক ক্যান্সার এর রোগিকে চিকিৎসার জন্য দিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ।
যেখানে সতীর্থ্য খেলোয়ারদের চোখে সাকিব আল হাসান ‘হিরো, সেখানে অরুচিশীল কতিপয় ক্রিকেট ভক্তরা কি লাইমলাইটে আসার জন্যই করছেন এমন সব মন্তব্য?
সাকিব কে নিয়ে ব্যঙ্গ করে গাওয়া অপরাধী গানটাকে নকল করে আপলোড করা হয়েছিলো বেশ কয়েকটা গ্রুপে। দেশের গণ্ডি পেড়িয়ে এটা চলে গিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও।
একটা গ্রুপে পোস্ট হওয়া ওই গানটাতে করা ভারতীয় কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মন্তব্য ছিলো এমন-
অতুল হালদার নামের একজন বলেছেন, ‘সাকিব আসলেই কপাল পোড়া, কারণ ও ভুল দেশে জন্মেছে।’
রনক নামের একজন লিখেছেন, ‘বাঙ্গালীরাই যদি এমন প্রতিভাবান একজনকে দাম না দেয়, তবে ভিনদেশিরা কিভাবে দিবে?’
মার্জিয়া খানম লিখেছেন, ‘তুমি বাংলাদেশের চোখে হিরো না হলেও, কলকাতায় তোমাকে আমরা হিরো মানি।’
অনীল ভাসকার লিখেছেন, ‘সেরা বাঙালি পুরষ্কার জেতা একটি মানুষকে এই মূল্যায়ন করলো বাংলাদেশ?’
এবার দেখুন, আপনাদের মত গুটি কয়েক সাকিব হেটার্সের জন্য পুরো বাংলাদেশ কে নিয়ে কথা বলছে অন্য দেশের ক্রিকেট প্রেমিরা। অথচ এই সাকিবই বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করছেন বাংলাদেশ কে।






























No comments